•  

    মানব শরীরে নভেল করনাভাইরাসের বিস্তার এবং আমাদের করনীয়

    নভেল করনাভাইরাস SARS-CoV-2 অতিদ্রুত মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ করতে পারে। যখন কোনও সংক্রামিত ব্যক্তি ভাইরাসজনিত ড্রপলেট হাঁচি কাশির মাধ্যমে বের করে দেয় এবং অন্য কেউ তাদের নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমিত হয়, তখন SARS-CoV-2 করোনাভাইরাস নাক এবং গলায় প্রবেশ করে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে ভাইরাসটি চোখ ও মুখের মাধ্যমেও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। নাকের কোষগুলিতে এনজিওটেনসিন-রূপান্তরকারী এনজাইম 2 (ACE2) নামে একটি রিসেপটর সমৃদ্ধ রয়েছে। ভাইরাসটির কোষে প্রবেশ করার জন্য ACE2 রিসেপ্টারের প্রয়োজন হয়। একবার ভিতরে প্রবেশের পরে, ভাইরাসটি কোষের যন্ত্রপাতিটি জোরপূর্বক নিজের করে নেয়, অগণিত কপি তৈরি করে এবং নতুন কোষগুলিতে আক্রমণ করে।

    ছবিঃ ACE2 রিসেপ্টর আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে আছে, যেটি নভেল করোনাভাইরাস ব্যাবহার করে কোষের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে।

    ভাইরাসের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে একটি সংক্রামিত ব্যক্তি এটির প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে দিতে পারে, বিশেষত প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বা তার মধ্যে। লক্ষণগুলি এই সময়ে অনুপস্থিত হতে পারে অথবা ভাইরাসের নতুন আক্রান্ত রোগী জ্বর, শুকনো কাশি, গলা ব্যথা, গন্ধ এবং স্বাদ হ্রাস, বা মাথা এবং শরীরের ব্যথা বিকাশ করতে পারে।

    যদি এই প্রাথমিক পর্যায়ে শারীরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা SARS-CoV-2 কে পিছনে না ফেলে, তবে ভাইরাসটি উইন্ডপাইপ এর মধ্যে থেকে তখন ফুসফুসে আক্রমণ করার জন্য যেতে থাকে, যেখানে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। ফুসফুসের কোষগুলি ACE2 রিসেপ্টরগুলিতে সমৃদ্ধ, যা ভাইরাসটিকে ফুসফুসের কোষের ভিতরে প্রবেশে সাহায্য করে।

    যেহেতু ACE2 রিসেপ্টর শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও থাকে তাই এটি অনুমেয় যে ফুসফুস ছাড়াও শরীরের অঙ্গে অনুপ্রবেশ করার সক্ষমতা ভাইরাসটি রাখতে পারে।

    প্রথমত, রোগীর ঘ্রান ও স্বাদশক্তির হ্রাস মস্তিষ্কের সাথে ভাইরাসটির একটি যোগসূত্র মনে করিয়ে দেয়। সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য মাত্রার কভিড-১৯ রোগী মস্তিষ্কস্ট্রোক সমস্যায় মারা গেছেন। জন হপকিন্স মেডিসিনের চিকিৎসক রবার্ট স্টিভেনস বলেছেন, ACE2 রিসেপ্টর নিউরাল কর্টেক্স এবং মস্তিষ্কের স্টেমে উপস্থিত রয়েছে। জাপানের একটি একটি কেস স্টাডিতে কভিড-১৯ রোগীর সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুয়িডে নতুন করোনাভাইরাসের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়। সুতরাং ভাইরাসটি আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ ক্ষমতা রাখে। তবে কোন পরিস্থিতিতে ভাইরাসটি মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং ACE2 রিসেপ্টরগুলির সাথে যোগাযোগ করতে পারে তা এখনও অজানা।

    মস্তিষ্ক ছাড়াও নতুন করোনভাইরাসটি নিম্ন পাচকের ট্রাকে সংক্রামিত করতে পারে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ACE2 রিসেপ্টর প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। ভাইরাল আরএনএ বাছাইকৃত রোগীদের মল নমুনায় পাওয়া গেছে। এবং একটি গবেষণাপত্রে, একটি চীনা দল কভিড-১৯ রোগীর গ্যাস্ট্রিক, ডুডোনাল কোষগুলিতে ভাইরাসের প্রোটিন শেল আবিষ্কার করেছে বলে জানিয়েছে।

    ACE2 রিসেপ্টর আছে এমন আরেকটি অঙ্গ- হৃদপিণ্ড। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কভিড-১৯ রোগী হৃদপিণ্ডজনিত সমস্যায় ভুগেন। এক্ষেত্রে ভাইরাসটি হৃদপিণ্ডের ACE2 রিসেপ্টর এর মাধ্যমে এই অঙ্গটিকে সরাসরি আক্রান্ত করে নাকি এটি একটি পরোক্ষ প্রভাব তা এখনও পরিপূর্ণভাবে জানা নেই।

    এছাড়া ACE2 রিসেপ্টর এর উপস্থিতি বৃক্ক এবং যকৃৎ কোষেও পাওয়া গেছে। উল্লেখযোগ্য রোগীর ক্ষেত্রে বৃক্কীয় সমস্যা দেখা গেছে। তাদের মূত্রে উচ্চমাত্রার প্রোটিন এবং রক্ত পাওয়া গেছে, যা বৃক্কের অকার্যক্রিয়তা বুঝায়। তাছাড়াও রোগীর যকৃৎ এর উপরেও খারাপ প্রভাব দেখতে পাওয়া গেছে। তবে এই প্রভাবগুলি ভাইরাসটি বৃক্ক এবং যকৃৎ কোষে নিজস্ব অনুপ্রবেশ এর ফলে নাকি পরক্ষ প্রভাব তা এখনও সম্পূর্ণ জানা নেই।

    এছাড়া ACE2 রিসেপ্টর আছে চর্ম ও অস্থিমজ্জাতে। সাম্প্রতিক ব্রিটিশ জার্নাল অফ ডারমাটোলজি এ প্রকাশিত আর্টিকেল এ গবেষকরা কভিড-১৯ রোগীর ৫ টি চর্ম সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তবে হাড়ের অস্থি মজ্জাতে ভাইরাসটি কোন প্রভাব ফেলতে পারে কি না এবং হলে কি ধরনের প্রভাব ফেলবে তা ভবিষ্যতে গবেষণা করে দেখার প্রয়োজন।

    ACE2 রিসেপ্টর মানুষের যৌনাঙ্গ কোষেও বিদ্যমান। তবে মহিলাদের তুলনায় পুরুষের যৌনাঙ্গ কোষে এর পরিমাণ বেশি। একটি প্রি-প্রিন্ট এ গবেষকরা যৌনাঙ্গ কোষেও ভাইরাসটির অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন এমনটি প্রকাশ করেছেন। তবে রোগের কোন পরিস্থিতিতে ভাইরাসটি মানুষের যৌনাঙ্গ কোষে অনুপ্রবেশ করে এবং পুরুষের শুক্রাশয়ে ACE2 রিসেপ্টর এর বেশি উপস্থিতি পুরুষের অধিক মৃত্যুঝুঁকির জন্য দায়ী কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরী। এবং সুস্থ হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে পরবর্তীতে এধরনের অনুপ্রবেশ বিশেষ করে পুরুষের প্রজনন ক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে কিনা তা একটি ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে করে দেখার প্রয়োজন।

    সুতরাং ভাইরাসটি অল্পসময়ে অধিক ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘ সময়ের জন্য একটি খারাপ প্রভাব রাখতে পারে। অতএব, ভাইরাসটি প্রতিরোধে আমাদের যথাসম্ভব সতর্কতা গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। সংক্রামণ কমানোর জন্য মুখোশ আর চশমার বাাবহার অপরিহার্য এবং আক্রান্ত হবার পরে স্বাস্থ্যক্ষতির ঝুঁকি কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ব-সতর্কতামূলক ব্যাবস্থা নিতে হবে।

    ড. মোঃ রেজাউল ইসলাম, DZNE, Göttingen, Germany

    ড. আনোয়ারুল আমিন, NCI, NIH, USA

    ড. আহসান রাহমান, NCI, NIH, USA

Comments

  • (no comments)

Post Comments

This website is created and hosted by Website.com's Site Builder.